Educational

যে তিনটি বিষয় ছাত্রজীবনকে বদলে দিতে পারে

গতিশীল মানবজীবনকে একটি ফলদ বৃক্ষের সাথে তুলনা করা হলে ছাত্রজীবন হলো চারা। মূলত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ কালীন সময়ে সীমাকে প্রচলিত ভাষায় ছাত্রজীবন বলা হয়। ছাত্রজীবন মূলত গড়ে ওঠে বিশ্বাস, ভাবনা এবং কর্মের সংমিশ্রণে। কার্ল্ফ্রাইড গ্রাফ ডার্ক্ষেইম বলেছেন, “একজন ছাত্রের জন্য তার ছাত্র জীবনের প্রতিটা ঘটনাই হলো এক একটা পরীক্ষা।“ তাই শিক্ষার্থী হিসেবে প্রতিটা ধাপে বিচক্ষণতার সাথে এগিয়ে যাওয়া উচিৎ। অনেকের ছাত্রজীবনের শুরুটা একভাবে হয়, শেষটা একেবারে বদলে যায়। এই আর্টিকেলে আমি এমন তিনটি বিষয়ের কথা উল্লেখ করবো, যেগুলো ছাত্রজীবনকে ইতিবাচক এবং নেতিবাচক- দু’ভাবেই বদলে ফেলতে পারে আমি এমন অনেক শিক্ষার্থীকে দেখেছি, যারা এই তিনটি কারণে বিপথে চলে গেছে। আবার কিছু এমন ছাত্র-ছাত্রী আছে, যারা এই তিনটির যেকোনো একটিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করে এবং নিয়ন্ত্রণের সাথে জীবনযাপন করে সফলতা অর্জন করেছে। তাই এক কথায় বলতে গেলে এই তিনটি নিয়ামক নিরপেক্ষ বিষয় এবং এর প্রভাব নির্ভর করে একজন শিক্ষার্থীর কাজের উপর। তো, দেরি না করে সেই তিনটি বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।

১. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
বর্তমানে আমরা বাস্তব জীবন অপেক্ষা ভার্চুয়াল জগৎকেই বেশি প্রাধান্য দিয়ে ফেলি বলে প্রথমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কথা বললাম। বেশকিছু শিক্ষার্থী আছে, যারা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে নিজেদেরকে সৃজনশীল হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করে। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ, পাঠ্যবস্তু নিয়ে একে অন্যের সাথে আলোচনা ইত্যাদি বিষয়ে তারা সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সহযোগিতা গ্রহণ করে জীবনের পথে এগিয়ে যায়। কিছু Productive Student আছে, যারা নিজেদের ডিজিটাল প্রোফাইলের সদ্ব্যবহার করে অর্জিত জ্ঞানকে সকলের মাঝে ছড়িয়ে দেয়। কেউ কেউ একটা বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য ইউটিউবের শরণাপন্ন হয়। এগুলো মূলত ভালো দিক, যার কল্যাণে শিক্ষার্থীদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। আমি এমন অনেক শিক্ষার্থীকে দেখেছি যারা সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে বড় বড় বিজ্ঞান সংগঠনের কর্মী হতে পেরেছে।
পক্ষান্তরে বেশকিছু শিক্ষার্থী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সঠিক ব্যবহার করতে পারে না। যার ফলে প্রতিনিয়ত তার নেতিবাচক পরিবর্তন ঘটে, যাকে এক কথায় বলা যেতে পারে Demotion। সোশ্যাল মিডিয়াতে বিভিন্ন অনর্থক কাজ (যেমনঃ ট্রল করা, খারাপ মিম পোস্ট করা কিংবা আজেবাজে পোস্ট/ছবি আপলোড করা) করে বহু শিক্ষার্থী বিগড়ে যাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়া গুলোতে এমন কিছু সেকশন আছে, যেগুলো কারো জন্যই ভালো নয় অথবা Age-Restricted। এমন ভয়ংকর ও বিপজ্জনক অংশের সাথে ইচ্ছাকৃতভাবে অথবা কৌতুহল প্রবণ হয়ে যুক্ত হওয়ার ফলে একজন শিক্ষার্থীর জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং বর্তমানে সেটাই হচ্ছে। টিকটকসহ কয়েকটি ডিজিটাল অ্যাপসের অপব্যবহার হচ্ছে। যদি বিদ্যার্থীরা সোশ্যাল মিডিয়াকে জীবন গঠনের হাতিয়ার বানাতে পারে তবেই সে সফল হতে পারবে। অন্যথায় তাকে ধ্বংস ও ব্যর্থতার সম্মুখীন হতে হবে। অভিভাবকগণের উচিত এ বিষয়ে সচেতন থেকে তাদের সন্তানদেরকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং তাদেরকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইতিবাচক ব্যবহার শেখানো। বর্তমান প্রযুক্তি নির্ভর সমাজে প্রযুক্তি বর্জন করা নয় বরং ইতিবাচকভাবে প্রযুক্তির ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের জীবনমান উন্নয়ন করতে হবে।

২. বন্ধু-বান্ধব
যেকোনো যুগেই বন্ধুবান্ধব একটি পরিচিত বিষয়। এখানে আমি বন্ধুবান্ধব বলতে বাস্তব জীবনের বন্ধু-বান্ধবকে বুঝিয়েছি।বন্ধু-বান্ধবদের প্রভাব একজন শিক্ষার্থীর জীবনে অনেক তাৎপর্যপূর্ণ। যেকোনো বিদ্যার্থী যদি তার বন্ধু-বান্ধবদের সাথে পাঠ্যবস্তু, সহশিক্ষা কার্যক্রম অথবা দক্ষতা নিয়ে আলোচনা ও অনুশীলন করে, তবে কিন্তু সে অনেকখানি সুফল পেতে পারে। গবেষকেরা বলছেন যে বন্ধুদের সাথে কোনো বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনা করলে তা সহজেই গ্রহণ করা সম্ভব হয় এবং বিষয়বস্তু অনেকদিন পর্যন্ত মনে থাকে। শুধু তা-ই নয় ভালো বন্ধুর সাথে মেলামেশার ফলে মানসিক অবস্থার উন্নতি ঘটে। সত্যিকার অর্থে শিক্ষার্থীর জীবনকে পজিটিভলি বদলাতে বন্ধুবান্ধব অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি নিয়ামক। কিন্তু আমরা অনেক সময় দেখি বন্ধু-বান্ধবদের পরামর্শ কিংবা তাদের কথায় শিক্ষার্থীরা নষ্ট হয়ে যায়। ছাত্রজীবনে অবক্ষয়ের পেছনে অনেক সময় এই বন্ধু বান্ধবই দায়ী হয়। প্রায় 86 শতাংশ বিদ্যার্থীর অবনতির মূল কারণ হলো ফ্রেন্ড সার্কেল। ইউনিভার্সিটি লাইফে অনেক শিক্ষার্থী বন্ধুদের কুমন্ত্রণায় পরে মাদকাসক্ত হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে অন্যান্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। আবার কলেজের অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী একই কারণে চেইন স্মোকারে পরিণত হয়। এইসব ঘটনার ফল হয় মারাত্মক। চরম অবক্ষয়ের শিকার হওয়া ছাত্র-ছাত্রীদের জীবনটা ধ্বংস হয়ে যায়। যদি ছাত্রছাত্রীরা বন্ধুত্বের বন্ধনকে ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট এর হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করে, তবে লাইফে অনেক বড় ইতিবাচক পরিবর্তন সাধন করা সম্ভবপর হয়। কিন্তু ভালো-মন্দ বিবেচনা না করে যদি কেউ বন্ধুত্বের মধ্যে জীবনকে কেন্দ্রীভূত করে, তবে তাকে অবশ্যই বিধ্বংসী ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে।

৩. রিলেশনশিপ
রিলেশনশিপ শব্দটি দ্বারা আমরা মূলত তরুণ-তরুণীর প্রেমের সম্পর্ককে বুঝি এখানে সেটাই বলা হচ্ছে।এই রিলেশনশিপের কারণে যদিও অনেকেই লেখাপড়া বা ক্যারিয়ার ভুলে অন্যরকম হয়ে যায়, তবুও চাইলে সোশ্যাল মিডিয়া এবং বন্ধুত্বের মতো একেও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। অনেকে মনে করে যে রিলেশন অনেকটা ওষুধের মতো। অল্প বা পরিমিত হলে ভালো এবং একবিন্দু মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া থেকে শুরু করে প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া পর্যন্ত ঘটাতে সক্ষম। সচেতন যে কোন ব্যক্তির বলবে, “যে বিষয়কে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না তা থেকে দূরে থাকাই ভালো।” এই প্রেমের সম্পর্ক থেকে কত বিপদ আর ক্ষতি টা না হয়! বর্তমানে আমাদের তরুণ প্রজন্ম দু’টি কারণে ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট থেকে পিছিয়ে যায়ঃ মাদক ও প্রেম। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় প্রেমের নামে অপবিত্রতা বা অবৈধ সম্পর্কের ফলে একজন মানুষের জীবন ও সম্মান নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু যদি এই বিষয়টিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, তবে কেমন হয়? তাহলে পারস্পারিক সম্পর্কের ভিত্তিতে আত্মউন্নয়ন বা Self-Development সম্ভব হয়। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে যে ইতিবাচক সম্পর্ক মানসিক অবস্থার উন্নতি ঘটায় তাই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত ও যোগ্য মানুষে রূপান্তরিত করতে হলে এই রিলেশনশিপ কে নিয়ন্ত্রণে রাখতেই হবে। তা না হলে ব্রেকআপ কিংবা সম্পর্ক ছেদের পর অনেকেই ফ্রাস্ট্রেটেড হয়ে ড্রাগ অথবা সুইসাইডকে বেছে নেয়। যার ফলে ভবিষ্যৎ পুরোটাই মেঘাচ্ছন্ন হয়ে যায়। তাই বুঝে-শুনে কখনোই এমন ভুল করা উচিৎ নয়।

তো, মাত্র তিনটি বিষয়কে যদি সঠিকভাবে গ্রহণ ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়, তাহলে একটা গোল্ডেন ক্যারিয়ার আমরা পেতে পারি। আর যদি আমাদের জীবন এই তিনটির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তবে লাইফ বরবাদ হয়ে যাবে। এমন অনেককে দেখেছি যারা নিজেদেরকে ইতিবাচকভাবে পরিবর্তন করে নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া, বন্ধুত্ব এবং রিলেশনশিপের নেতিবাচক প্রভাবে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। আবার কিছু শিক্ষার্থী বিভিন্ন ক্রিয়েটিভ অ্যাক্টিভিটি যেমন প্রোগ্রামিং, ব্লগিং শিখতে গিয়েও এই তিনটি প্যাঁচালের গ্যাড়াকলে পড়ে শেষ সীমানায় যেতে পারে না। তাই তুমি যদি তোমার স্টুডেন্ট লাইফ কে রঙিন করতে চাও, তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধু-বান্ধব এবং রিলেশনশিপকে কন্ট্রোলে আনো। তাহলেই তুমি সফলতার পথে অনেকখানি এগিয়ে যেতে পারবে। তোমার জন্য শুভকামনা রইল।

Leave a Reply

Back to top button